ক্রিপ্টোকারেন্সি:ভবিষ্যতের বৈশ্বিক লেনদেনের মাধ্যম?

সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনীতির ময়দানে চরম মন্দা চলছে করোনা ভাইরাসজনিত অতিমারির কারণে।কিন্তু তার মধ্যে একটি সুখবর বিটকয়েনের মূল্য ১৯২০০ মার্কিন ডলারের সমান।ভারতীয় মুদ্রায় এর মান দাঁড়াবে ১৫ লক্ষ টাকা। যা একটি সর্বকালীন রেকর্ড। যদিও অনেকেই জানেন না যে ছাতার মাথা এই বিটকয়েন কি। আর তার দাম বাড়া নিয়ে এত মাতামাতির কি আছে!
তাদের জন্য বলি বিটকয়েন হলো একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি। এবার আপনারা বলবেন যে সে আবার কি চিজ!তাহলে তাদের বলতে হয় বিশ্বে টাকার ইতিহাস ও বিবর্তন।

এখনো পর্যন্ত তিন ধরণের স্বীকৃত মুদ্রা আছে:
১.কমোডিটি মানি।
২.রিপ্রেজেন্টটিভ মানি।
৩.ফিয়াট মানি।


এবার এগুলো কি সেটা নিয়ে আলোচনা করি

১.কমোডিটি মানি:- বিশ্বে প্রথমদিকে বিনিময় প্রথা ছিল। আমরা সকলেই ইতিহাসে পড়েছি একথা। কিন্তু তখন বিনিময় হতো শস্যের বদলে শস্য,গবাদি পশু বা অন্য উৎপাদিত বস্তু। তারপরে সময়ের সাথে সাথে ধাতু আবিষ্কৃত হলো। দূরদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ হলো।তখন দূরদেশে জিনিসপত্র নিয়ে গিয়ে বিনিময় করা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে গেল।তাই তখন মানুষ কোনো বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে লাগল।বিকল্প সমাধান হল মূল্যবান ধাতু(সোনা,রুপো ও তামা)।এগুলোর নির্দিষ্ট মূল্য আছে।তাছাড়া এগুলো কম পরিমানে অনেক মূল্য বহন করে।ফলে বয়ে নিয়ে যাওয়াতেও কোনও সমস্যা রইলো না।এটা খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে গত আঠারোর শতক পর্যন্ত চালু ছিল।

২.রিপ্রেজেন্টটিভ মানি:- নামেই বোঝা যাচ্ছে যে এটি কোনো কিছুকে রিপ্রেজেন্ট করছে।তো এটা রিপ্রেজেন্ট করে কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের মূল্যকে যেটা সাধারণত সোনা এবং কিছু ক্ষেত্রে রুপোও হতো।পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকে সারা বিশ্বে ইউরোপীয় দেশগুলির প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে।তারা কমোডিটি মানির পরিবর্তে কাগুজে মুদ্রা চালু করে।কিন্তু এই মুদ্রার নিজস্ব কোনো দাম নেই।তাহলে!এর দাম নির্ধারণ করা হতো সোনার দামের উপর ভিত্তি করে।কিভাবে!বিভিন্ন দেশের সোনার দাম তো বিভিন্ন!এর উত্তর হল কোনো দেশের স্বর্ণ মজুদের উপর ভিত্তি করে সেই দেশের মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হত।এর দ্বারা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের পরিবর্তে যেকোনো সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা পাওয়া যেতো।একে বলা হয় স্বর্ণমান বা Gold Standard।যেহেতু বৃটেন সেই সময় সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল,তাই তার সঞ্চিত স্বর্ণের পরিমান সবচেয়ে বেশি ছিল।এবং লন্ডন ছিল বিশ্ব ব্যাংকিংয়ের কেন্দ্র।একারণে পাউন্ড স্টার্লিং ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা।

৩.ফিয়াট মানি:- একবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে আর ইউরোপে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে।ফলে ইউরোপীয় দেশগুলি তাদের মজুদকৃত স্বর্ণের ভিত্তিতে যে পরিমাণ নোট ছাপতে পারবে তার থেকে বেশি ছাপতে আরম্ভ করলো।ফলে মুদ্রার দাম গেল কমে।আর এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম তিন বছর যুদ্ধ থেকে সরে থাকলো।তার বদলে ইউরোপীয় দেশগুলিকে যুদ্ধের সরঞ্জাম ও রসদ রপ্তানি করতে লাগল।প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অধিকাংশ দেশ স্বর্ণমান ছাড়তে বাধ্য হল।ফলে এতে মুদ্রার মূল্য বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়া হল।একে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘Free Floating Exchanges’।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একই দৃশ্য।আমেরিকা প্রথম আড়াই বছর যুদ্ধ থেকে দূরে থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে থাকল।বিনিময়ে কেবলমাত্র স্বর্ন ছাড়া অন্যকিছুতে মূল্য নিতে অস্বীকার করলো।ফলে তাদের স্বর্ণের মজুদ হু হু করে বাড়তে লাগল।১৯৪৭ সালে আমেরিকা একাই বিশ্বের মোট স্বর্ণের ৭০ শতাংশের মালিক ছিল।এই প্রসঙ্গে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ২১তম মার্কিন রাষ্ট্রপতি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন,””We have gold because we cannot trust governments.”প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সমস্ত শক্তিশালী মুদ্রা ফিয়াট মানিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল কিন্তু মার্কিন ডলার তখনও স্বর্ণমানের সাথে যুক্ত ছিল এবং মার্কিন ব্যাংকিং সিস্টেম সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ছিল;তাই দেশগুলি ঠিক করে যে মার্কিন ডলারকে রিজার্ভ মানি(Reserve money) হিসেবে ধরা হবে।রিজার্ভ মানি হলো যে মুদ্রার মানকে মাপকাঠি ধরা হয় এবং দেশগুলি সেই মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিময়ের জন্য জমা করে রাখে।এইভাবে ব্রিটিশ স্টার্লিং পাউন্ডের পরিবর্তে মার্কিন ডলার রিজার্ভ মানি হয়ে উঠল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দেশগুলি বুঝতে পারে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি মার্কিন নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে।তাই ৪৪ টি ইউরোপীয় দেশ ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে সংযুক্ত যুক্তরাজ্যের হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটন উডস নামক স্থানে একটি আলোচনায় বসে।এই আলোচনায় ঠিক হয় যে ‘মার্কিন ডলারের সাথে যেমন স্বর্ণের যোগ ছিল থাকবে,এবং মার্কিন ডলারকে যেকোনো সময় স্বর্ণে পরিণত করা যাবে।’এই ব্যবস্থাকে ‘ব্রেটন উডস ব্যবস্থা’ বলে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Now

Categories

ABOUT US

Dainikchorcha.com is a blog where we post blogs related to Web design and graphics. We offer a wide variety of high quality, unique and updated Responsive WordPress Themes and plugin to suit your needs.

Contact us: [email protected]

FOLLOW US